আর্নিয়া খানম আন্নি
ইলেকট্রনিক ডিভাইস মোবাইল এখন সকলের নিত্তনৈমিত্তিক সঙ্গী। দিনের পর দিন এর ব্যবহার যেমন বাড়ছে ঠিক তেমনই বাড়ছে এর অপব্যবহার। বর্তমান যুগের বেশিরভাগ সন্তানসন্ততি তার পিতামাতার সাথে দূরত্ব বাড়ছে এই মোবাইলের প্রতি অতিরিক্ত আসক্ত হওয়ার কারণে। এসকল ডিভাইস ব্যবহারকারীরা অবসরের সময় তাদের যে সময়টুকু পরিবার অথবা মা বাবাকে দেয়া উচিত সে সময়টুকু তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে ব্যস্ত।
দেখা যাচ্ছে, এমন অনেক ব্যবহারকারী আছে যারা একটা সময় তাদের মা বাবার সাথে বাজে ব্যবহার করে তাদের সাথে একটু কথা বলতে চাওয়ার কারণে। এই প্রজন্ম এখন জানে না স্কুল, কলেজ ছুটির পর দাদু বা নানু বাড়িতে কিভাবে সময় কাটাতে হয়। তারা সেই সময়টাও দেখা যাচ্ছে দাদু নানুর সাথে সময় না দিয়ে টিকটক, ফেসবুক, ইন্সট্রাসহ আরো বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যস্ত।
যে সকল যোগাযোগমাধ্যম রয়েছে তার মাঝে ফেসবুক সবচেয়ে জনপ্রিয়। বর্তমানে ফেসবুকের দৈনিক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১৯৩ কোটি। যা মাসিক ব্যবহারকারীর থেকে এক তৃতীয়াংশ কম হলেও বিশ্লেষকদের মতে, এই অনুপাতটি বেশ বড়। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে প্রায় ৫০০ কোটি মানুষ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে থাকেন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৬০০ কোটি।
nagad
বাংলাদেশেও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের দিক থেকে এগিয়ে পুরুষরা। প্রায় ৬৭.৪ শতাংশ পুরুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। অন্যদিকে ৩২.৬ শতাংশ নারী সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় থাকেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে অনেক এগিয়ে পুরুষ। প্রায় ৭৩ শতাংশ পুরুষ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন এ অঞ্চলে।
দিন দিন এর ব্যবহার যেমন বাড়ছে তদরূপ এর অপব্যবহার বাড়ছে। মানুষ তার ব্যক্তিগত সময়টুকুকে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার না করে, সে সময়টুকু সোশ্যাল মিডিয়ায় নানা ভিডিও বা চ্যাটিং করে ব্যয় করছে। এতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন থেকে সম্পর্ক ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে। সন্তান থেকে পিতামাতার এই সম্পর্কের দৃঢ়তা বৃদ্ধাশ্রমের মতো ভয়ংকর জায়গায় স্থান পায় জš§দানকারী মাতা পিতা।
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই এই সমস্যার সম্মুখীন সকলে। বর্তমানে পৃথিবীজুড়ে প্রায় ৫০০ কোটি মানুষ সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে থাকেন। ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৭ সাল নাগাদ এ সংখ্যা বেড়ে হবে ৬০০ কোটি!
মহাদেশ হিসেবে এশিয়া অঞ্চলের মানুষই এগিয়ে আছেন সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে। এ অঞ্চলে প্রায় ২৯৪১.০১ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। তার পরে আছে আমেরিকা মহাদেশ। দুই আমেরিকা মহাদেশের ৮১৯.২৯ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। যার মধ্যে উত্তর আমেরিকায় ৪৪৭.৮২ ও দক্ষিণ আমেরিকায় ৩১৬.৭৮।
তবে স্বতন্ত্রভাবে এ দুই মহাদেশ থেকে এগিয়ে ইউরোপ। ইউরোপের ৬৮১.৫৬ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। সবচেয়ে কম সক্রিয় আফ্রিকা মহাদেশের মানুষ। এ মহাদেশের ৪২৭.০৫ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। দেশের হিসাবে চীনের মানুষই সবচেয়ে বেশি সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। চীনের ১০২১.৯৬ মিলিয়ন লোক সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করেন। এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ভারত। দেশটিতে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৭৫৫.৪৭ মিলিয়ন। তৃতীয় যুক্তরাষ্ট্র। আমাদের দেশেও সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীর সংখ্যা কম নয়, ২৪.৪৯ মিলিয়ন।
পিতামাতা একটা সময় পর তার সন্তানের ওপর নির্ভর থাকে আর সে মা বাবা-ই যখন তার সন্তানদের সে সময় কাছে পায় না তখন তারা নিজেকে অবহেলিত ভাবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সন্তানেরা একটা সময় পর মা বাবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাদের মতো জীবন পরিচালনা করে থাকে। আর সেটা তাদের সমাজে বা সংস্কৃতিতে সহজেই মেনে নেয় কিন্তু বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের মনে মিশে আছে নাড়ির টান। বাবা মা সন্তান জন্মের পর থেকেই তাদের নানা প্রতিকূলতার মাঝে তাদের লালন পালন করে থাকেন। সে জন্যই তারা তাদের সন্তানের প্রতি এক বুক আশা নিয়ে থাকে কখন তার সন্তান তাকে একটু সময় দিবে, একটু কাছে নিয়ে বসবে বা তাদের সাথে অবসর সময় কাটাবে।
তাই আমাদের এই প্রজন্মের উচিত তাদের সন্তানদের সময় দেয়া, মা বাবার প্রতি অভিপ্রকাশ ব্যক্ত করা, প্রত্যেক বাবা মার উচিত তাদের অবসর সময়টাকে সন্তানদের জন্য রাখা। শিশুদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাদের সাথে সবকিছু খোলামেলা আলোচনা করা। জন্মদিন কিংবা বিশেষ দিনে শিশুদের বই উপহার দেয়া। তাকে আস্তে আস্তে বই পড়ার অভ্যাসে নিয়ে আসতে হবে। বই পড়লে এক তো জ্ঞান বাড়বে অন্যদিকে ফেসবুকের আসক্তি কমবে।
ইন্টারনেটের কুফল থেকে সন্তানদের বাঁচাতে বিকল্প হিসেবে খেলাধুলা বা পরিবারের সদস্যদের সময় দেওয়া একান্ত প্রয়োজন। প্রতিদিন বিকেলে পড়া শেষে তাকে খেলাধুলার সময় দিতে হবে। আমাদেরও সচেতন হতে হবে, বাবা মা কে সময় দিতে হবে। তাদের সাথে কুশল বিনিময় করতে হবে। অবসর সময়টাতে বিনোদন দিতে হবে শুধু তাই নয়, ছুটির সময়গুলোতে কোনো দূরে কোথাও ঘুরে আসার পরিকল্পনা করতে হবে। এভাবে ভার্চুয়াল জগৎ থেকে আমাদের সরে আসতে হবে।
ভার্চুয়াল জগতে আসক্তির ফলে মানুষ সত্যিকার জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আত্মীয়তার বন্ধন দৃঢ় করতে হবে। মোবাইলকে সঠিক কাজে ব্যবহার করতে হবে, মুছে দিতে হবে মোবাইলের নেতিবাচক দিকগুলোর প্রতি আসক্তি।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট