মোঃ মামুন অর রশিদ
নির্বাচনে জনগণ কি শুধু ভোটার? উত্তর হলো ‘না’। জনগণ যেহেতু প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক, তাই নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগের পাশাপাশি নির্বাচনি আচরণবিধি সম্পর্কেও জনগণের সচেতন থাকা উচিত। কোথাও নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘিত হলে জনগণের দায়িত্ব হলো মৌখিকভাবে বাধা প্রদান করা এবং প্রশাসনকে অবহিত করা। জনগণের একটি বৃহৎ অংশ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী, সমর্থক ও শুভাকাক্সক্ষী। রাজনৈতিক দলের কর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে অনেকেই অজ্ঞতাবশত নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন। আবার কেউ কেউ নির্বাচনি আচরণবিধি জানা সত্ত্বেও ইচ্ছাকৃতভাবে তা লঙ্ঘন করেন। রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকদের বাইরে সাধারণ জনগণের একটি বৃহৎ অংশ নির্বাচনি আচরণবিধি সম্পর্কে তেমন কিছু জানেন না। নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করার প্রথম ধাপ হলো, নির্বাচনি আচরণবিধি সম্পর্কে জনগণসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে অবহিত ও সচেতন করা।
আগামী ৭ই জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সারাদেশে পুরোদমে শুরু হয়েছে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের খবর প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করার কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক প্রার্থী-সমর্থককে জরিমানাও করা হয়েছে। নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালনে প্রশাসন, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী, সমর্থক, সাধারণ জনগণসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২-এর ৯১ (খ) অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশন ‘সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮ (২০১৩ সালে সর্বশেষ সংশোধিত)’ প্রণয়ন করেছে। জনগণের জানার প্রয়োজন রয়েছে- এমন কিছু নির্বাচনি আচরণবিধি উপস্থাপন করা হলো :
কোনো প্রার্থী কিংবা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচন-পূর্ব সময়ে (তপশিল ঘোষণার দিন হতে নির্বাচনের ফলাফল সরকারি গেজেটে প্রকাশের তারিখ পর্যন্ত) কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে বা গোপনে কোনো চাঁদা বা অনুদান প্রদান করতে বা প্রদানের অঙ্গীকার করতে পারবেন না।
নির্বাচন-পূর্ব সময়ে কোনো সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি (প্রধানমন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার, সরকারের মন্ত্রী, চিফ হুইপ, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা, বিরোধী দলীয় উপনেতা, প্রতিমন্ত্রী, হুইপ, উপমন্ত্রী বা তাঁদের সমপদমর্যাদার কোনো ব্যক্তি, সংসদ-সদস্য ও সিটি কর্পোরেশনের মেয়র) সরকারি বা আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের তহবিল হতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে কোনো অনুদান ঘোষণা বা বরাদ্দ প্রদান বা অর্থ অবমুক্ত করতে পারবেন না। এছাড়া সরকারি ডাক-বাংলো, রেস্ট হাউজ, সার্কিট হাউজ বা কোনো সরকারি কার্যালয়কে কোনো দল বা প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে প্রচারের স্থান হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।
কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা দলের মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী কিংবা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সভা করতে চাইলে প্রস্তাবিত সভার কমপক্ষে ২৪ ঘণ্টা পূর্বে তার স্থান ও সময় সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে এবং কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি গ্রহণ করতে হবে। তবে জনগণের চলাচলের বিঘ্ন সৃষ্টি করতে পারে, এমন কোনো সড়কে জনসভা কিংবা পথসভা করা যাবে না।
নির্বাচনি প্রচারণায় ব্যবহৃতব্য ব্যানার ও পোস্টার সাদা-কালো হতে হবে। ব্যানারের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যথাক্রমে ৩ মিটার ও ১ মিটারের বেশি হওয়া যাবে না। পোস্টারের দৈর্ঘ্য হবে অনধিক ৬০ সেন্টিমিটার এবং প্রস্থ অনধিক ৪৫ সেন্টিমিটার। রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী কেবল তার প্রতীক, নিজের ছবি ও বর্তমান দলীয় প্রধানের ছবি পোস্টারে ছাপাতে পারবেন। অন্য কোনো ছবি বা প্রতীক ছাপাতে পারবেন না।
সিটি কর্পোরেশন ও পৌর এলাকায় অবস্থিত দালান, দেওয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি বা অন্য কোনো দণ্ডায়মান বস্তুতে কোনো প্রার্থী কিংবা তার পক্ষে কোনো ব্যক্তি কোনো পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল লাগাতে পারবেন না। এছাড়া সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনা বা কোনো যানবাহনে পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল লাগানো যাবে না। কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ইত্যাদির উপর অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর পোস্টার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ইত্যাদি লাগানো যাবে না বা কোনো ক্ষতিসাধন করা যাবে না।
কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি কোন বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল, নৌ-যান, ট্রেন কিংবা অন্য কোনো যান্ত্রিক যানবাহন সহকারে মিছিল বা মশাল মিছিল কিংবা শোডাউন করতে পারবেন না। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময়ও কোনো মিছিল কিংবা শোডাউন করতে পারবেন না।
দেওয়ালে লিখে কোনো নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না। এ ছাড়া দালান, থাম, বাড়ি বা ঘরের ছাদ, সেতু, সড়ক দ্বীপ, রোড ডিভাইডার, যানবাহন বা অন্য কোনো স্থাপনায় প্রচারণামূলক কোনো লিখন বা অঙ্কন করা যাবে না। প্রতীক হিসাবে কোনো জীবন্ত প্রাণীর ছবি ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচনি প্রচারণায় কোনো গেইট বা তোরণ নির্মাণ করা যাবে না। নির্বাচনি প্রচারণার জন্য ৪০০ বর্গফুটের অধিক স্থান নিয়ে কোনো প্যান্ডেল তৈরি করা যাবে না। নির্বাচনি প্রচারণার অংশ হিসাবে বিদ্যুতের সাহায্যে কোনো আলোকসজ্জাও করা যাবে না।
কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল কিংবা দলের মনোনীত প্রার্থী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী বা তাদের পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি প্রতিটি ইউনিয়নে সর্বোচ্চ একটি নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপন করতে পারবেন। পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশন এলাকার ক্ষেত্রে প্রতি ওয়ার্ডে একটির অধিক নির্বাচনি ক্যাম্প স্থাপন করা যাবে না। নির্বাচনি কাম্পে ভোটারগণকে কোনো ধরনের কোমল পানীয় বা খাদ্য পরিবেশন বা উপঢৌকন প্রদান করা যাবে না। নির্বাচনি প্রচারণার জন্য প্রার্থীর ছবি বা প্রার্থীর পক্ষে প্রচারণামূলক কোনো বক্তব্য বা কোনো শার্ট, জ্যাকেট, ফতুয়া ইত্যাদি ব্যবহার করা যাবে না।
নির্বাচনি প্রচারণাকালে ব্যক্তিগত চরিত্র হনন করে বক্তব্য প্রদান বা কোনো ধরনের তিক্ত বা উস্কানিমূলক বা মানহানিকর কিংবা লিঙ্গ, সাম্প্রদায়িকতা বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হয়, এমন কোনো বক্তব্য প্রদান করা যাবে না। কোনো ধর্মীয় উপাসনালয়ে কোনো নির্বাচনি প্রচারণা চালানো যাবে না।
কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি নির্বাচনি এলাকায় মাইক বা শব্দের মাত্রা বর্ধনকারী অন্য কোনো যন্ত্রের ব্যবহার দুপুর ২ টা হতে রাত ৮ টার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবেন।
কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পূর্বে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি বা সদস্য হিসাবে নির্বাচিত বা মনোনীত হয়ে থাকলে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে তিনি বা তার মনোনীত কোনো ব্যক্তি উক্ত প্রতিষ্ঠানের কোনো সভায় সভাপতিত্ব বা অংশগ্রহণ করতে পারবেন না অথবা উক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোনো কাজে জড়িত হবেন না।
কোনো প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি উল্লিখিত কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক ছয় মাসের কারাদণ্ড অথবা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল নির্বাচন-পূর্ব সময়ে উল্লিখিত কোনো বিধান লঙ্ঘন করলে অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবে।
নির্বাচনি আচরণবিধি যথাযথ প্রতিপালনের মাধ্যমে নির্বাচন সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা সম্ভব। নির্বাচনি আচরণবিধিতে হেভিওয়েট প্রার্থীর জন্য আলাদা কোনো বিধি নেই। নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। জনগণের একটি বৃহৎ অংশ নির্বাচনি আচরণবিধি না জানায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের অনেক ঘটনার তথ্যই প্রশাসনের নিকট পৌঁছায় না। জনগণ যদি নির্বাচনি আচরণবিধি সম্পর্কে সচেতন হন, তাহলে তারা আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রতিবাদ করতে পারবেন, প্রয়োজনে প্রশাসনকে অবহিত করতে পারবেন। ৯৯৯ নম্বরে ফোন করেও নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন-সংক্রান্ত তথ্য জানানোর সুযোগ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাহায্যে নির্বাচনি আচরণবিধি-সংক্রান্ত সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করছে। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার পাশাপাশি আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগের মাধ্যমেও তৃণমূল পর্যায়ের জনগোষ্ঠীকে নির্বাচনি আচরণবিধি সম্পর্কে সচেতন করার উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। জনগণ ও নির্বাচন-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যদি নির্বাচনি আচরণবিধি সম্পর্কে সচেতন থাকেন এবং প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেন, তবেই আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করা সম্ভব।
লেখক : সিনিয়র তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস, রংপুর