আর্কাইভ  শুক্রবার ● ৪ এপ্রিল ২০২৫ ● ২১ চৈত্র ১৪৩১
আর্কাইভ   শুক্রবার ● ৪ এপ্রিল ২০২৫
শুভেচ্ছাবার্তা:
উত্তর বাংলা ডটকম পরিবারের পক্ষ থেকে সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা। ঈদ মোবারক ।

‘অবন্তিকা’ই যেন শেষ হয়... প্লিজ

সোমবার, ১৮ মার্চ ২০২৪, রাত ০৯:০৬

Advertisement

রাহাত মিনহাজ

ফাইরুজ অবন্তিকার মৃত্যু পুরো জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারকে প্রবলভাবে আলোড়িত, ব্যথিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। আমি নিশ্চিত তার আত্মহত্যার রাতে এ প্রতিষ্ঠানের অনেকেই চোখের পাতা এক করতে পারেননি। শিক্ষার্থীরা ছিলেন আতঙ্কিত, দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। যদিও শুরু থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের তরফ থেকেও খুবই সংবেদনশীল ও ত্বরিত পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে। যতদূর জানি, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আরও অনেক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে। যাতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন শঙ্কামুক্ত, নিরাপদ ও সহজ করা যায়।

শুধু ফাইরুজ অবন্তিকা নয়, বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষাপটে শিক্ষক কেন নিপীড়ক হন, সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিশোধপরায়ণ ঘৃণ্য আচরণ করে থাকেন, তা সামনে নিয়ে আসা ও নিপীড়কদের বিচার করা সত্যিই জরুরি হয়ে পড়েছে। একজন সহপাঠীও কেন নিপীড়ক ও অপরাধীর মতো আচরণ করছেন তাও বিবেচনা ও বিচার করা খুবই জরুরি। কারণ গুটিকয়েক মস্তিষ্কবিকৃত, প্রতিশোধপরায়ণ, যৌন নিপীড়ক শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কারণে পুরো শিক্ষকসমাজ আজ অপরাধীর কাঠগড়ায়। কলঙ্কের মুখোমুখি। এমন ঘটনা শিক্ষক সমাজের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন করছে। একজন সামান্য শিক্ষক হিসেবে আমিও চরম অস্বস্তিতে আছি। এভাবে চলতে পারে না।

আমি মনে করি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা তাদের শিক্ষকদের পিতা-মাতার মতোই মনে করেন। তারা সন্তানদের শ্রেণিকক্ষে পাঠিয়ে নিরাপদ, নিশ্চিত থাকতে চান। তারা কামনা করেন, সন্তানদের জীবন পথ চলার উপযোগী হিসেবে তাদের সন্তানদের শিক্ষকরাই গড়ে তুলবেন। জীবনের পথ বাতলে দেবেন। শিক্ষার্থীদের নিজেদের সন্তানের মতো করে বিপদে-আপদে আগলে রাখবেন।

কিন্তু হায়! আমরা কী দেখছি? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্তানতুল্য শিক্ষার্থীদের নিপীড়ন করা হচ্ছে। সন্তানের যথাযথ বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন একজন শিক্ষক। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার ধ্বংস করতে শত্রুতাবশত নিয়ামকের ভূমিকা পালন করছেন শিক্ষক। গুটিকয়েক এমন শিক্ষকের কারণে সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। তৈরি হচ্ছে আস্থার সংকট। আতঙ্কগ্রস্ত করছে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের।

ফাইরুজ অবন্তিকার মৃত্যুতে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে আস্থাহীনতার পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ঠিক করতে হবে। আগেও উল্লেখ করেছি, নতুন উপাচার্য অধ্যাপক ড. সাদেকা হালিম এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত অত্যন্ত সংবেদনশীল ও কার্যকর ভূমিকা পালন করেছেন। একজন শিক্ষক ও সমাজবিজ্ঞানী হিসেবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে কাজ করার বিস্তর অভিজ্ঞতা রয়েছে বর্তমান উপাচার্যের। আর সে কারণেই শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনকে নিরাপদ করতে তার কাছে অভিভাবকদের প্রত্যাশা আরও বেশি। আশা রাখি, তিনি এ বিষয়ে আরও কার্যকর ও যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নেবেন, যা এ প্রতিষ্ঠানের ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীর পরিবার আশ্বস্ত হতে পারে। তাদের সন্তানদের নিরাপদ বলে মনে করতে পারে।

ফাইরুজ অবন্তিকার আত্মহনন নিশ্চিতভাবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। নাজুক ও সংবেদনশীল বয়সের এ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আমাদের কীভাবে ডিল করা উচিত সেই বিষয়গুলো সামনে এনেছে। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য যে অতি গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তা নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এ বিষয়গুলো যাতে সংবেদনশীলভাবে আমলে নেয়, সেই কামনা রইল।

আরেকটি বিষয়, আমি এর আগেও লিখেছি সারা দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ও কঠিন সময় পার করে থাকেন। পুরাতন ঢাকার খুবই স্বল্প জায়গায় গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো খুবই সংকীর্ণ। জনাকীর্ণ ব্যবসাকেন্দ্রের মধ্যে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যথাযথ শিক্ষার পরিবেশ কতটুকু আছে তা নতুন করে চিন্তা করার দরকার আছে। ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থীদের জন্য রয়েছে মাত্র একটি আবাসিক হল। যাতে মাত্র কয়েক হাজার নারী শিক্ষার্থী থাকতে পারেন। তাই এসব অবকাঠামোগত বাধা দূর করতে দ্রুত নতুন ক্যাম্পাসের কাজ শেষ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানোও খুবই জরুরি। আশা করি বর্তমান প্রশাসন এ বিষয়গুলোতে নজর দেবেন।

আর শেষ কথা একটাই ফাইরুজ অবন্তিকাই যেন শেষ হয়। যে পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন তা গ্রহণ করুন। যতটা কঠোরতা প্রয়োজন কঠোর হোন। কিন্তু আর একজন শিক্ষার্থীকেও যাতে ফাইরুজ অবন্তিকার ভাগ্য বরণ করতে না হয়। প্লিজ...!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন


Link copied