নিউজ ডেস্ক: জুলাই-আগস্টের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে অন্তত চৌদ্দশ’র মতো মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে হাজারের অধিক গুলিতে মুত্যু হয়ে থাকতে পরে বলে ধারণা করেছে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর)।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধান করেছে।
আন্দোলনকারীদের মৃত্যু নিয়ে জাতিসংঘের সংস্থাটি ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের তদন্ত বিশ্লেষণ করেছে। সেখানে কোন ধরনের অস্ত্রে মৃত্যু হয়েছে, তা তাদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজের (ঢামেক) ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের তদন্তে ১৩০টি মৃত্যুর বিশ্লেষণ থেকে দেখা গেছে, মোট মৃত্যুর ৭৮ শতাংশই আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে হয়েছে। ওএইচসিএইচআর অনুমিত এক হাজার ৪০০টি মৃত্যুর মধ্যে গুলিতে মৃত্যু হাজারের বেশি হতে পারে। এসব মৃত্যু সাধারণত রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহার করা অস্ত্রের মাধ্যমে ঘটেছে, যা সাধারণ নাগরিকদের কাছে সহজলভ্য নয়।
কেমন রাইফেলের গুলিতে মৃত্যু হয়েছে সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মোট মৃত্যুর ৬৬ শতাংশই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন স্বয়ংক্রিয় ও আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেলের গুলিতে হয়েছে। বিক্ষোভ দমনে পুলিশও এসব অস্ত্র ব্যবহার করেছে। আরও ১২ শতাংশ মৃত্যু শটগানের গুলিতে হয়েছে। শটগানে এসব প্রাণঘাতী গুলিভর্তি (শিল্প মানদণ্ড অনুসারে ‘নম্বর ৮ ধাতব গুলি’) ছিল। এই অস্ত্র বাংলাদেশ পুলিশ ও আনসার/ভিডিপির সদস্যরাও ব্যবহার করেন। এই তথ্য আরও বড় পরিসরের একটি নির্ভরযোগ্য ও গোপনীয় সূত্রের তথ্যের সঙ্গে মিলে যায়, যা নিশ্চিত করেছে যে, অধিকাংশ মৃত্যু নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের কারণেই হয়েছে।
‘এই পরিসংখ্যানগুলো ওএইচসিএইচআরের ফরেনসিক চিকিৎসক এবং অস্ত্র বিশেষজ্ঞ দ্বারা সংগৃহীত এবং বিশ্লেষণ করা অন্যান্য তথ্যের সাথে মিলে যায়, যা দেখায় যে, গুলিবিদ্ধদের শরীরে যে গুলি পাওয়া গেছে, তা বাংলাদেশ অর্ডন্যান্স ফ্যাক্টরিতে তৈরি ৭ দশমিক ৬২×৩৯ মিলিমিটার আকারের সামরিক মানের গুলি। ’
এ ছাড়াও নিরস্ত্র সাধারণ মানুষের ওপর বিশেষ ধরনের বর্মভেদী (আর্মার-পিয়ার্সিং) ৭ দশমিক ৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের গুলি কিছু ঘটনায় ব্যবহার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
বেসামরিক অস্ত্র নিয়ে জাতিসংঘের এই সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্দোলন চলাকালে যেসব ক্ষেত্রে বেসামরিক লোকেরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করেন, সেসব ক্ষেত্রে তাদের হাতে পিস্তল, রিভলভার, সাবমেশিন গান, দেশীয় অস্ত্র এবং স্পোর্টিং শটগান দেখা যায়। কিছু ঘটনায়, বিশেষ করে আগস্টের শুরুর দিকে, কিছু ব্যক্তিকে ট্যাকটিক্যাল শটগান ও আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল ব্যবহার করতেও দেখা যায়। তবে বেসামরিকদের ব্যবহৃত অস্ত্রের কারণে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল খুবই কম।
প্রথম পর্ব
হেলিকপ্টার থেকে গুলি প্রসঙ্গে যা আছে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে
জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিক্ষোভকারীদের ভয়ভীতি দেখাতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। পুলিশ মহাপরিদর্শক ও র্যাবের মহাপরিচালক বলছেন, র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তবে তারা নিশ্চিত করতে পারেননি যে, র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধানে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে রাজধানীর বিভিন্নস্থানে এবং পাশ্ববর্তী গাজীপুরে হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হয়েছে। তখন হেলিকপ্টারের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। আলোচিত সেই হেলিকপ্টারের ব্যবহার নিয়ে তথ্যানুসন্ধান করেছে ওএইচসিএইচআর।
বিভিন্ন ইউনিটের হেলিকপ্টার নিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভের সাথে সম্পর্কিতভাবে হেলিকপ্টার মোতায়েন করেছিল। বিশেষ করে, র্যাবের কালো হেলিকপ্টার বিক্ষোভকারীদের ভীতি প্রদর্শন এবং তাদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। সিনিয়র কর্মকর্তাদের মতে, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিশেষভাবে আরও বেশি হেলিকপ্টার মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে র্যাবের পূর্ববর্তী কৌশলের মতোই বিক্ষোভকারীদের ভয় দেখানো যায়।
এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী বিভিন্নজনের সাক্ষী নিয়েছে ওএইচসিএইচআর। সেই সাক্ষ্য অনুযায়ী, ১৮ জুলাই মিরপুর ও মহাখালী, ১৮ ও ১৯ জুলাই ধানমন্ডি, ১৯ জুলাই বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, রামপুরা ও শাহবাগ, ১৯ জুলাই এবং ২ ও ৩ আগস্ট বসুন্ধরা, ২০ জুলাই গাজীপুর এবং ২০ ও ২১ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে বারবার র্যাব বা পুলিশের হেলিকপ্টার থেকে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করা হয়েছিল। এ ছাড়াও, ১৮ জুলাই রামপুরায় সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপের ঘটনাও ঘটেছিল।
‘সাক্ষীদের ভাষ্যমতে, ১৯-২১ জুলাই সময়কালে বাড্ডা, বসুন্ধরা, গাজীপুর, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর, মহাখালী, মোহাম্মদপুর এবং রামপুরায় হেলিকপ্টার থেকে রাইফেল বা শটগানের মাধ্যমে প্রাণঘাতী গোলাবারুদ নিক্ষেপ করা হয়েছিল। ৫ আগস্ট যমুনা ফিউচার পার্ক এলাকায় একজন ব্যক্তি আর্মার-পিয়ার্সিং গুলির টুকরোর আঘাতে আহত হন, যা পরে ওএইচসিএইচআর দ্বারা পরীক্ষা করা হয়। ’
এই ঘটনায় প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বিক্ষোভকারীদের ওপর হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানো স্বভাবতই নির্বিচার, যা মানবাধিকার মানদণ্ডের লঙ্ঘন। এক সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন যে, এই ধরনের অস্ত্র নির্দিষ্টভাবে এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে ব্যবহার করা সম্ভব নয়, যারা সরাসরি মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের আসন্ন হুমকি সৃষ্টি করছে।
হেলিকপ্টারে গুলির প্রশ্নে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও র্যাবের মহাপরিচালকের বক্তব্য নিয়েছে ওএইচসিএসআর। সেখানে পুলিশের মহাপরিদর্শক ও র্যাবের মহাপরিচালক স্বীকার করেছেন যে, র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে বিক্ষোভকারীদের ওপর টিয়ার গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তবে তারা নিশ্চিত করতে পারেননি যে, র্যাবের হেলিকপ্টার থেকে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল কি না। র্যাব ওএইচসিএইচআরের কাছে জানিয়েছে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত তাদের হেলিকপ্টার থেকে ৭৩৮টি টিয়ার গ্যাস শেল, ১৯০টি সাউন্ড গ্রেনেড এবং ৫৫৭টি স্টান গ্রেনেড নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তবে কোনো রাইফেল বা শটগান ব্যবহার করা হয়নি।
তবে হেলিকপ্টার ব্যবহারের ঘটনায় ভিডিও সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করেছেন। সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওএইচসিএইচআর একাধিক ভিডিও সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করেছে, যেখানে র্যাব ও পুলিশের হেলিকপ্টার থেকে টিয়ার গ্যাস লঞ্চার ব্যবহারের দৃশ্য দেখা গেছে। এই লঞ্চারগুলো দূর থেকে রাইফেল বা শটগানের মতো দেখাতে পারে, তবে টিয়ার গ্যাস গ্রেনেড ছোড়ার সময় একটি স্বতন্ত্র সাদা ধোঁয়ার রেখা সৃষ্টি করে। ওএইচসিএইচআর এমন কোনো ভিডিও সংগ্রহ করতে পারেনি যেখানে স্পষ্টভাবে হেলিকপ্টার থেকে রাইফেল বা শটগান দিয়ে গুলি ছোড়া হয়েছে। তবে এটি লক্ষণীয় যে, প্রত্যক্ষদর্শীরা যে সময়গুলোর কথা উল্লেখ করেছেন, তখন সরকার মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করে রেখেছিল, ফলে সামাজিক মাধ্যম বা ওয়েবসাইটে ভিডিও প্রকাশ করা সম্ভব ছিল না।
‘সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে, ওএইচসিএইচআর নিশ্চিত বা নাকচ করতে পারছে না যে, হেলিকপ্টার থেকে রাইফেল বা শটগান দিয়ে গুলি চালানো হয়েছিল কি না। এটি সম্ভব যে, ওপর থেকে আসা কিছু গুলি আসলে উঁচু স্থানে অবস্থান নেওয়া বন্দুকধারীদের দ্বারা ছোড়া হয়েছিল, অথবা আকাশে নিক্ষিপ্ত গুলি পরে নিচে পড়ে গিয়ে কারও গায়ে লেগেছে, কিংবা কোনো বস্তুতে লেগে প্রতিক্ষিপ্ত হয়ে ভুক্তভোগীদের আঘাত করেছে। বিষয়টি আরও তদন্তের প্রয়োজন’ বলে মনে করছে সংস্থাটি।
দ্বিতীয় পর্ব
বিক্ষোভ দমনে গ্রেপ্তার, হত্যা, লাশ লুকানোর নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা
জুলাই অভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারীদের গ্রেপ্তার, হত্যা এমনকি মরদেহ লুকিয়ে ফেলারও নির্দেশ দেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার ও নিরাপত্তা বাহিনী যে সহিংসতা চালিয়েছে তা সমন্বয়ের ভূমিকায় ছিলেন ক্ষমতাচ্যুত এই প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। তৎকালীন সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার সাক্ষ্য অনুসারে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশনা উদ্ধৃত করা হয় প্রতিবেদনে। আর এ ধরনের নির্দেশনাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক বলে মন্তব্য করেছে জাতিসংঘের সংস্থাটি।
প্রতিবেদন অনুসারে, জুলাই-আগস্টে অভ্যুত্থান চলাকালে এক হাজার ৪শর বেশি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। যাদের বেশিরভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর চালানো সামরিক অস্ত্র ও শটগানের গুলিতে মারা যান। হাজার হাজার ছাত্র-জনতা গুরুতর আহত হয়েছেন। পঙ্গু হয়েছেন অনেকেই। অনেকের দুই চোখ, কারো কারো এক চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। ১১ হাজার সাতশর বেশি মানুষকে র্যাব ও পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আন্দোলনজুড়ে শেখ হাসিনা নৃশংসভাবে বিক্ষোভ দমন, হত্যা, গ্রেপ্তার এবং লাশ লুকাতে নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে নির্দেশ দেন। এমনকি আন্দোলনকারীদের কটাক্ষ করে বিভিন্ন মন্তব্যও করেন। এর মধ্যে পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ছাত্রদের সঙ্গে সমঝোতা করতেও নির্দেশনা আসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখে থাকা সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে।
শুধু রাষ্ট্রীয় বাহিনীই নয়, গুরুতর এই মানবাধিকার লঙ্ঘনে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনীগুলোও ব্যবহার করা হয়েছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদন বলছে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের পূর্ণজ্ঞাতসারে, সমন্বয় এবং নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। আর সমন্বিতভাবে এসব ঘটনার নেতৃত্ব দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ সাক্ষী এবং অন্যান্য অভ্যন্তরীণ সূত্রের থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছে যে, পুলিশ, আধাসামরিক, সামরিক এবং গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের সহিংস উপাদানগুলিকে (সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী) ব্যবহার করে একটি সমন্বিত এবং পদ্ধতিগত পন্থায় গুরুতর মানবাধিকারলঙ্ঘন করা হয়েছে। আর রাজনৈতিক নেতৃত্বের পূর্ণজ্ঞাতসারে, সমন্বয় এবং নির্দেশনার ভিত্তিতেই এই নিপীড়নের ঘটনা ঘটেছে। নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার তৎপরতাগুলো সমন্বিতভাবে করার যুথবদ্ধ প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাস্তবে মাঠপর্যায়ে কী ঘটছে সেই পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভিন্ন সূত্র থেকে নিয়মিত প্রতিবেদন পেতেন তারা উভয়ে।
অতিরিক্ত বল প্রয়োগের বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্তকর্তাদের সাক্ষ্য অনুসারে, ২১ জুলাই এবং আগস্টের শুরুতে প্রধানমন্ত্রীকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের তরফ থেকে প্রতিবেদন সরবরাহ করা হয়, যেখানে বিশেষভাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের বিষয়ে উদ্বেগের কথাও ছিল। রাজনৈতিক নেতা এবং পুলিশ ও সেনাবাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সম্পর্কে বাস্তব ধারণা নিতে সরাসরি মাঠ পরিস্থিতি পরিদর্শন করেন। এরপর আবার রাজনৈতিক নেতৃত্ব (হাসিনার সরকার) বিজিবি, র্যাব, ডিজিএফআই, পুলিশ ও ডিবির জন্য সরাসরি কিছু আদেশ ও নির্দেশনা জারি করে, যার মাধ্যমে তাদের কর্মকাণ্ডের অনুমোদন ও দিকনির্দেশ করা হয়। এসব বাহিনী প্রতিবাদকারী ও সাধারণ নাগরিকদের বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা এবং নির্বিচারে আটকের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনে জড়িয়ে পড়ে।
বিক্ষোভকারীদের দমন ও হত্যার বিষয়ে প্রতিবেদনের বিস্তৃত অংশে আরও বলা হয়, সম্পৃক্ত সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য ও অন্তর্বর্তী সরকারের দেওয়া তথ্য ওএইচসিএইচআরের বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কেননা, এই নির্বিচার বলপ্রয়োগ ১৮ জুলাই রাতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে নিরাপত্তা বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাদের দেওয়া নির্দেশনার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। পরদিন ১৯ জুলাই এই নির্দেশনা আরও জোরদার করা হয়।
ওএইচসিএইচআরের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ জুলাই বিকেলে ও সন্ধ্যায় রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশনের সদরদপ্তরে একদল সহিংস বিক্ষোভকারী হামলা চালায়। টিভি স্টেশনে মোতায়েন পুলিশের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। ২৮ জন সেখানে হামলা চালিয়েছিল। তারা টিভি চ্যানেলের চত্বরে যানবাহনে ও ভবনের একটি অংশে আগুন লাগিয়ে দেয়। সেসময় টিভির স্টাফরা ভবনের ভেতরে অবস্থান করছিলেন। তাদের জীবনরক্ষা এবং টিভি স্টেশনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিপক্ষের হাতে চলে যাওয়া ঠেকানোর জন্য সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পুনঃনিশ্চিত আদেশে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) মোতায়েন করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্বীকার করেন যে, বিজিবিকে টিভি স্টেশনের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
প্রতিবেদনে একজন সাবেক সিনিয়র কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, বাংলাদেশ টেলিভিশনে হামলার পর থেকে বিজিবিকে ‘স্ট্রাইক ফোর্স’ হিসেবে ব্যবহার করাহয়। ১৮ জুলাই সন্ধ্যায় তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি ‘কোর কমিটি’ বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন, যেখানে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধানরা উপস্থিত ছিলেন। ওই সভায় অংশ নেওয়াদের মধ্যে একজন ওএইচসিএইচআরকে জানিয়েছেন, বৈঠকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বিজিবি কমান্ডারকে প্রকাশ্যে নির্দেশ দেন, যেন তারা আরও সহজে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহার করেন।
সিনিয়র কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য অনুসারে, পরদিন ১৯ জুলাই আরেকটি বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী নিজেই নিরাপত্তাবাহিনীর কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন বিক্ষোভ দমন করতে প্রয়োজনে বিক্ষোভকারীদের হত্যা করতে। তিনি বিশেষভাবে বলেন, ‘বিক্ষোভের মূল হোতাদের, দাঙ্গাকারীদের গ্রেপ্তার করো, হত্যা করো এবং তাদের মরদেহ লুকিয়ে ফেলো। ’
ওএইচসিএইচআরের মতে, এই সাক্ষ্য আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের ১৯ জুলাই সাংবাদিকদের দেওয়া বক্তব্যের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীকে দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে’। এই ধরনের নির্দেশনা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে স্পষ্টতই সাংঘর্ষিক।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ওই নির্দেশনার সারবত্তাও খুঁজে পেয়েছে জাতিসংঘের এই সংস্থাটি। এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওএইচসিএইচআরের তথ্যমতে, প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নির্দেশ পুনর্ব্যক্ত হওয়ার পরপরই এর প্রভাব সরাসরি মাঠ পর্যায়ে দেখা যায়। ১৮ জুলাই যেখানে আনুমানিক ১০০ জন নিহত হয়েছিলেন, সেখানে ১৯ জুলাই একদিনের ব্যবধানে নিহতের সংখ্যা প্রায় তিনশোতে পৌঁছে যায়।
‘এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সব তথ্যের গভীর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর মনে করে যে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সাবেক সরকার এবং তার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সহিংস গোষ্ঠীগুলোর সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন চালিয়েছে। এসব আইন ভঙ্গের ঘটনা রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে, সমন্বয়ে ও নির্দেশনায় ঘটেছে। ’
আওয়ামী লীগ সরকার জনগণের কী ধরণের অধিকার লঙ্ঘন করেছে সে বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সাবেক সরকারের মাধ্যমে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের মধ্যে রয়েছে বেঁচে থাকার অধিকার লঙ্ঘন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার অধিকার লঙ্ঘন, নির্যাতন ও অমানবিক আচরণ থেকে মুক্ত থাকার অধিকার লঙ্ঘন, আটক ব্যক্তিদের প্রতি মানবিক ও মর্যাদাপূর্ণ আচরণের অধিকার লঙ্ঘন, ন্যায়বিচারের অধিকার লঙ্ঘন, গোপনীয়তার অধিকার লঙ্ঘন, মতামত ও প্রকাশের স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার লঙ্ঘন, বৈষম্যহীনতার অধিকার লঙ্ঘন, সর্বোচ্চ স্বাস্থ্যসেবা লাভের অধিকার লঙ্ঘন, শিশুদের অধিকার লঙ্ঘন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কার্যকর প্রতিকার পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘন।
তবে কাচের মতো নৃশংসতার বিষয়ে স্বচ্ছ প্রমাণ থাকলেও জাতিসংঘের সাক্ষাৎকারে সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন ভিন্ন কথা। আবার সেসব কর্মকর্তার ওই মতকে যুক্তি দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে সংস্থাটি ।
এই বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওএইচসিএইচআরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কয়েকজন সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা দাবি করেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিরাপত্তা বাহিনীকে বলপ্রয়োগ সীমিত রাখতে এবং আইনের মধ্যে থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু মাঠ পর্যায়ের বাহিনীগুলো তা লঙ্ঘন করে। তবে, এই দাবিগুলো কম বিশ্বাসযোগ্য। ঢাকাসহ সারাদেশে নিরাপত্তা বাহিনী একই ধরনের গুরুতর লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়েছে। বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনী আওয়ামী লীগের অস্ত্রধারী সমর্থকদের নিয়ে সমন্বিত অভিযান চালিয়েছে, যা দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। ওএইচসিএইচআরের মতে, দেশের বিভিন্ন স্থানের সব নিরাপত্তা বাহিনী একইভাবে শীর্ষ নেতৃত্বের আদেশ এবং নির্দেশাবলী পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষা করবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম। বরং পূর্ববর্তী বছরগুলোতে সরকারের দমনের সময় প্রতিষ্ঠিত ধরন অনুসরণ করে আইন লঙ্ঘন করা হয়েছে, যদিও ২০২৪ সালের জুলাই এবং আগস্টে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল নজিরবিহীন। সবচেয়ে গুরুতর লঙ্ঘনগুলোর বেশিরভাগই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অধীনে বিজিবি ও র্যাব এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর অধীনে ডিজিএফআই ও এনএসআই-এর মতো অভিজাত, সুপ্রশিক্ষিত এবং শৃঙ্খলাবদ্ধ সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছে।
১৯ জুলাইয়ের আলোচিত সেই বৈঠক ছাড়াও অন্যান্য বৈঠকেও বিভিন্ন নির্দেশনাও দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেই বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যান্য বৈঠকেও তিনি ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে আন্দোলনকারীদের সরাতে সহিংস পদ্ধতি নিয়ে সিনিয়র নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য অনুসারে, গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও ডিজিএফআই-এর মাধ্যমে ছাত্রনেতাদের নির্বিচারে গ্রেপ্তার এবং আটকের ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার পরিকল্পনা অনুমোদন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। ২৯ জুলাই অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি ছাত্রনেতাদের জোরপূর্বক স্বীকারোক্তির ভিডিও প্রকাশ করে জনসংযোগ বিপর্যয় সৃষ্টির জন্য গোয়েন্দা শাখার প্রধানকে (হারুন অর রশীদ) সরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, যদিও ছাত্রদের নির্বিচারে আটক এবং জোরপূর্বক তদন্তের কোনো নির্দেশ তিনি দেননি। ৪ আগস্ট সকালে প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের একটি বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন এবং সন্ধ্যায় তার বাসভবনে দ্বিতীয় বৈঠক করেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং নিরাপত্তা খাতের সবচেয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ‘মার্চ টু ঢাকা’ প্রতিহত করতে বলপ্রয়োগের পরিকল্পনায় সম্মত হন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনটি প্রকাশের পরদিন ১৩ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন বলেন, অস্ত্রের ব্যবহার এবং আহত-নিহতের পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, একটা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র বহুবিস্তৃত (ওয়াইডস্প্রেড) ও পদ্ধতিগতভাবে (সিস্টেমেটিক) একটা জনগোষ্ঠীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তাদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য। এটা মানবতাবিরোধী অপরাধের পক্ষে একটা সুস্পষ্ট ও জোরালো প্রমাণ। এই প্রতিবেদন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে একটা এভিডেন্স (প্রমাণ) হিসেবে ট্রাইব্যুনালে আসবে।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু জাতিসংঘ বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য একটা সংস্থা, তাই তাদের এ প্রতিবেদনটি সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ। কোনো দলের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রতিবেদনটি করা হয়নি। আমাদের (প্রসিকিউশন) সঙ্গেও কথা বলেননি জাতিসংঘের তদন্তকারীরা। তারা অপরাধীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। যেখানে কথা বলা দরকার, সেই জায়গায় কথা বলেছেন। সুতরাং এটা অকাট্য দলিল, প্রমাণ হিসেবে এই আদালতে ব্যবহার করা যাবে।
তৃতীয় পর্ব
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে হামলার নেতৃত্বে সশস্ত্র আওয়ামী সমর্থকরা
‘আন্দোলন অব্যাহত থাকায় আওয়ামী লীগের সশস্ত্র সমর্থকরা রাষ্ট্রের নিরাপত্তাবাহিনীর সঙ্গে মিলে কিংবা তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালাতে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে সংসদ সদস্য ও সরকারি কর্মকর্তারা এসব হামলার নেতৃত্ব দেন।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলা ও বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের সশস্ত্র আক্রমণের ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন যখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছিল তখন রাজনৈতিকভাবে নড়ে চড়ে বসে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার। তাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ থেকে এ আন্দোলন দমনের নির্দেশনা আসে দলের অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর। একইসঙ্গে চলতে থাকে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে নিপীড়ন।
বিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইডেন কলেজ, উত্তরা, যাত্রাবাড়ী, রায়েরবাগ, খুলনা, কুমিল্লা ও সাভারের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এইসব স্থানে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর সশস্ত্র হামলা করেছে। আর এসব স্থানে হামলার ঘটনার সত্যতাও পেয়েছে জাতিসংঘ।
ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ৫ জুন বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ একটি রায়ে সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহাল করেন। আদালত ২০১৮ সালে সরকারের নেওয়া সেই সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। ওই সময়ে ব্যাপক ছাত্র আন্দোলনের পর কোটা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছিল।
শিক্ষার্থীরা কোটা ব্যবস্থাকে বৈষম্যমূলক বলে মনে করে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, তাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের কিছু সমর্থকও ছিলেন। শিক্ষার্থীদের মতে, এটি মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের অগ্রাধিকার দেয়, যা মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগের নীতির পরিপন্থি। অনেক কোটা সুবিধাভোগী এমন পরিবার থেকে এসেছেন, যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত। ছাত্র আন্দোলনকারীদের একজন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সরকারি চাকরির সুযোগ আমার জন্য নেই, কারণ আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। আমি শুধু গ্রামের একজন সাধারণ ছেলে। ”
ছাত্র আন্দোলনের মূলকারণ শুধু কোটা ব্যবস্থাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না বরং এর গভীরে ছিল বিগত সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বঞ্চনার বিরুদ্ধে জমে থাকা দীর্ঘদিনের ক্ষোভ। আন্দোলনের নেতা ও অংশগ্রহণকারীরা ওএইচসিএইচআরের কাছে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। তাদের ক্ষোভ দারুণভাবে উঠে আসে এক নারী আন্দোলনকারীর লেখা এবং ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া একটি গানে: “তেলা মাথায় দিচ্ছে তেল, দুর্নীতির কাছে সবই ফেল, ভালা মাইনসের কোনো ভাত নাই”। অল্পসময়ের মধ্যেই আন্দোলন সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রতিবাদে রূপ নেয়। অধিকাংশ বাংলাদেশিই এই আন্দোলনের সঙ্গে একমত ছিলেন এবং তারা মনে করতেন, দেশ ভুল পথে এগোচ্ছে।
প্রতিবাদ ঠেকাতে সরকার প্রাণঘাতী পথে ধাবিত হয় উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার প্রতিবাদ আন্দোলন ঠেকাতে ধাপে ধাপে পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগতভাবে দমন পীড়ন বাড়িয়ে তোলে। প্রথমে ভয়ভীতি দেখানোর চেষ্টা করা হলেও পরে ধীরে ধীরে আরও প্রাণঘাতী ও সামরিক কৌশলে দমন অভিযান চালানো হয়, যার ফলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে।
এক পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে সমঅংশীদার হয়ে ওঠে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের আহ্বানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রলীগ আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালায়।
এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৪ জুলাইয়ের পরবর্তী দুই দিন ধরে এই হামলা অব্যাহত ছিল। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা তাদের আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকেন। আন্দোলনকারীরা ছাত্রলীগের হাত থেকে নিজেদের রক্ষার কাজটিও চালিয়ে যেতে থাকেন। ওএইচসিএইচআর জানতে পারে, এক্ষেত্রে পুলিশের ভূমিকা ছিল নির্বিকার। একনেতা ওএইচসিএইচআরকে বলেন, “আমাদের (আওয়ামী লীগের) সাধারণ সম্পাদকের আহ্বানে মাঠে নেমে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ঠেকানোর কথা ছিল ছাত্রলীগ কর্মীদের। কিন্তু যা ঘটে তা অপ্রত্যাশিত ছিল, শিক্ষার্থীরা পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। “
‘ছাত্রলীগ এককভাবে ক্রমবর্ধমান আন্দোলন দমন করার জন্য পর্যাপ্ত শক্তি অর্জনে ব্যর্থ হলে পুলিশ আরও বেশি আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেয়। ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য স্থানে পুলিশ আন্দোলনকারীদের ওপর কম-মারাত্মক অস্ত্র যেমন টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট ব্যবহার করলেও কিছু ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী ধাতব গুলি ভর্তি বন্দুক ব্যবহার করে। অন্যদিকে, সশস্ত্র আওয়ামী লীগ সমর্থকেরা পুলিশের সহায়তায় হামলা চালান। এসব হামলায় ১৬ জুলাই অন্তত ছয় জন নিহত হন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন (রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের) শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। তার হত্যার ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়লে আরও বেশি শিক্ষার্থী, বিশেষ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে যোগ দেন। ’
ব্যাপক বিক্ষোভ ও সহিংসতা শুরু হওয়ার আগে থেকেই সরকার আরও সামরিক কৌশল ব্যবহারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পুলিশকে সহায়তা করতে আধা সামরিক বাহিনী মোতায়েন করা হয়, যারা সামরিক অস্ত্রে সজ্জিত ছিল। সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনে করতেন, “যদি আমরা আমাদের ‘হেভি ইউনিট’ মোতায়েন করি, তাহলে কেবল ‘জিহাদিরাই’ রাস্তায় থাকবে, আর অন্যরা ঘরে ফিরে যাবে। ”
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর জানায়, ২০২৪ সালের ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত বিগত সরকার, সরকারের নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা এবং আওয়ামী লীগের সহিংস গোষ্ঠীগুলো একসঙ্গে পরিকল্পিতভাবে আন্দোলন দমাতে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন চালিয়েছে। প্রথম দিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আন্দোলন দমনে টিয়ার গ্যাস, রাবার বুলেট, সাউন্ড ও স্টান গ্রেনেড এবং ধাতব গুলিভর্তি শটগান ব্যবহার করে। এসব অস্ত্রের ব্যবহারের ফলে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ঘটে, যার মধ্যে অন্যতম ছিল শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হুমকি হয়ে না দাঁড়ালেও শটগানের গুলিতে তাকে জীবন দিতে হয়। আন্দোলন আরও তীব্র হলে নিরাপত্তা বাহিনী আরও প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ করতে শুরু করে। তারা সামরিক রাইফেল ব্যবহার করে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারী ও পথচারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়, এর ফলে শত শত মানুষ নিহত হন।
আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়ী করে প্রতিবেদনে বলা হয়, শান্তিপূর্ণ সমাবেশ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমনের লক্ষ্যে এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তার অধিকার লঙ্ঘন করে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা ছাত্রলীগের সহিংস সদস্য ও সমর্থকদের সশস্ত্র হামলার উসকানি দেন। অনেক ক্ষেত্রে, এসব হামলায় অন্যান্য আওয়ামী লীগ সমর্থকেরাও যুক্ত ছিলেন। কর্তৃপক্ষ (আইনশৃঙ্খলা বাহিনী) তাদের বাধা না দিয়ে বরং দায়মুক্তির সুযোগ দিয়ে সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়। ভুক্তভোগী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সরাসরি সাক্ষ্য, পাশাপাশি ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর নিশ্চিত হতে পেরেছে, আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একটি বড় অংশ পুলিশসহ সমন্বিতভাবে বা ঘনিষ্ঠ সহযোগিতায় আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে সহিংস হামলা চালিয়েছে। তারা ব্যাপক ও বেআইনি সহিংসতার মাধ্যমে আন্দোলন দমন করতে সরকারের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করেছে।
‘সশস্ত্র ছাত্রলীগ ও অন্যান্য আওয়ামী লীগ সমর্থকরা বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিসোঁটা, দা ও আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে হামলা চালায়, যা জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের উসকানিতে ঘটে। অনেক ক্ষেত্রে এসব হামলা পুলিশের সঙ্গে মিলিতভাবে করা হয়। ’
এসব হামলায় ও আক্রমনে যেসব আন্দোলনকারী আহত হয়েছিলেন, তাদের চিকিৎসায় সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগ সমর্থকরাও বাধা দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। পরিকল্পিতভাবে দেওয়া এই বাধা আহতদের অবস্থা আরও গুরুতর করে এবং প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ছাত্রলীগের হামলার ঘটনার কথা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৪ থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত যখন আন্দোলন মূলত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা এর আশপাশে চলছিল, তখন ছাত্রলীগের সহিংস সদস্যরা কখনো নিজে, কখনো আওয়ামী লীগের অন্যান্য সমর্থকদের সঙ্গে মিলিত হয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর লাঠিসোঁটা, ধারালো অস্ত্র এবং কিছু ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে হামলা চালায়। এই হামলাগুলো আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের উসকানিতে সংঘটিত হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ১৪ থেকে ১৫ জুলাই রাতের মধ্যে ধারালো ও ভোঁতা অস্ত্রধারী কিছু আওয়ামী লীগ সমর্থককে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে আসা হয় এবং তারা ক্যাম্পাসের চারপাশে ভয়ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। প্রায় রাত ৩টার দিকে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন রাজু ভাস্কর্যে সমবেত আওয়ামী লীগ সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, “সোমবার (১৫ জুলাই) থেকে বাংলাদেশের রাস্তায় কোনো রাজাকার থাকবে না। এটি প্রতিটি জেলা, শহর, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নেতাদের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা— যারা অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়, যারা শহীদদের অবমাননা করবে, তাদের রাস্তায়ই প্রতিহত করা হবে। ”
১৫ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বিগত সরকারের মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, “শিক্ষার্থীরা অহংকারী হয়ে উঠেছে। আমরা ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত। ” তিনি আরও বলেন, “কোটা সংস্কার আন্দোলনের কয়েকজন নেতার বক্তব্যের জবাব দিতে ছাত্রলীগ প্রস্তুত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাজাকার স্লোগান দেওয়া আমাদের জাতীয় অনুভূতির প্রতি স্পষ্ট ঔদ্ধত্য। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিরুদ্ধে যেকোনো অপশক্তিকে আমরা কঠোর হাতে প্রতিহত করব। ” এর আগেই সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী আন্দোলনকারীদের ‘দেশদ্রোহী’ বা ‘রাজাকার’ বলে অভিহিত করেন এবং দাবি করেন, তাদের প্রতিবাদের কোনো অধিকার নেই। তখনকার প্রধানমন্ত্রী প্রথম এই শব্দ ব্যবহার করার পর, মন্ত্রীরা আরও সরাসরি ও উসকানিমূলক বক্তব্য দিতে থাকেন।
এ বিষয়ে কিছু মন্ত্রীর মুখোমুখি হয়েছিল জাতিসংঘের সংস্থাটি। প্রতিবেদনে সে বিষয়ে বলা হয়, ওএইচসিএইচআরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কিছু সাবেক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা (মন্ত্রী) দাবি করেন, এসব শুধুমাত্র ‘রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর’ ছিল। অন্যদিকে কিছু জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এসব মন্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে নিজেদের দূরে সরিয়ে নেন। মন্ত্রিসভার সাবেক এক সদস্য বিশেষভাবে ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যকে ‘ভুল’ বলে স্বীকার করেন এবং বলেন, ‘এ ধরনের কথা বলা উচিত হয়নি’। ওএইচসিএইচআরের সঙ্গে সাক্ষাৎকারে কোনো আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগ নেতা বা মন্ত্রী এমন কোনো বক্তব্য বা নির্দেশনার কথা বলেননি, যেখানে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এসব মন্তব্য থেকে সরে এসেছে বা বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। তারা এটাও স্বীকার করেননি যে, ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগ সমর্থকদের সহিংসতা বন্ধের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিছু সাক্ষাৎকারদাতা স্বীকার করেছেন, আওয়ামী লীগ চাইলে সশস্ত্র সমর্থকদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারত— যেমন দলীয় কার্যালয় রক্ষার জন্য তাদের মোতায়েন করা। তবে, দলটি কোথাও তাদের সমর্থকদের সহিংসতা বন্ধের আহ্বান জানায়নি।
ওএইচসিএইচআর নিশ্চিত হয়েছে, আওয়ামী লীগ নেতাদের সহিংসতা উসকে দেওয়া বক্তব্যের পরপরই ছাত্রলীগের সদস্য ও সমর্থকরা সরাসরি ছাত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর একাধিক হামলা চালায়। কিছু প্রত্যক্ষদর্শী হামলাকারীদের মধ্যে ছাত্রলীগের নেতা বা সদস্যদের শনাক্ত করেছেন। হামলাকারীরা প্রায়ই ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পর্কিত স্লোগান দিত। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ, ভিডিও ও ছবি থেকে দেখা যায়, তারা অস্ত্র প্রদর্শন করেছিল, হেলমেট পরিহিত ছিল। তারা সংঘবদ্ধ কায়দায় সহিংসতা চালায়, যা ছাত্রলীগের আগের হামলার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ।
এ বিষয়ে বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ওএইচসিএইচআরকে জানান, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগ সমর্থকদের আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেক অনিয়ম হয় এবং তারা সেসব অস্ত্র আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ব্যবহার করে। বাংলাদেশ পুলিশ ওএইচসিএইচআরকে ৯৫ জনের নাম ও তাদের ভূমিকার তালিকা সরবরাহ করেছে। পুলিশ মনে করে, আন্দোলনের সময় সহিংস হামলা চালানোর জন্য তারা অস্ত্র সরবরাহ করে। এর মধ্যে ১০ জন তখনকার সংসদ সদস্য, ১৪ জন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা, ১৬ জন যুবলীগ নেতা, ১৬ জন ছাত্রলীগ নেতা ও সাতজন পুলিশ সদস্য অন্তর্ভুক্ত। পুলিশ আরও ১৬০ জন আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক নেতা ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মকর্তার নাম ও তাদের ভূমিকার তালিকা দেয়, যাদের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষকে সহিংস হামলায় উসকানি দেওয়া বা নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে মিলে এবং তাদের সহায়তায় আন্দোলন দমনে হামলা চালায়। কিছু হামলা পরিচালিত হয় আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা ও সরকারি কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে, যার মধ্যে সংসদ সদস্যরাও অন্তর্ভুক্ত। প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, ভিডিও ও অন্যান্য সূত্রের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর দেশজুড়ে বেশ কয়েকটি ঘটনার প্রমাণ সংগ্রহ করেছে।
এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত সকল তথ্যের গভীর বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ওএইচসিএইচআর মনে করে যে, ১৫ জুলাই থেকে ৫ আগস্টের মধ্যে সাবেক সরকার এবং তার নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত সহিংস গোষ্ঠীগুলোর সহযোগিতায় পরিকল্পিতভাবে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নির্যাতন চালিয়েছে। এসব আইন ভঙ্গের ঘটনা রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও নিরাপত্তা খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের জ্ঞাতসারে, সমন্বয়ে ও নির্দেশনায় ঘটেছে।