আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ১৮ জানুয়ারী ২০২২ ● ৫ মাঘ ১৪২৮
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ১৮ জানুয়ারী ২০২২

লালমনিরহাটে হিমাংশু-সাবিত্রী দম্পতির মৃত্যুর জট খুলতে মাঠে ডিবি পুলিশ

বৃহস্পতিবার, ১৩ জানুয়ারী ২০২২, সকাল ০৯:৫০

লালমনিরহাট প্রতিনিধি: লালমনিরহাটের হাতীবান্ধায় হিমাংশু-সাবিত্রী দম্পতির মৃত্যু নিয়ে জট খুলতে মাঠে নেমেছে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) একটি দল। গত মঙ্গলবার সাবিত্রী রানী হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল ও হিমাংশু রায়ের আত্মহত্যার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন পুলিশের রংপুর রেঞ্জের অ্যাডিশনাল ডিআইজি (অপরারেশনস অ্যান্ড ক্রাইম) ওয়ালিদ হোসেন। ইতোমধ্যে সাবিত্রী রানী হত্যাকাণ্ড তদন্দের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে গোয়েন্দা পুলিশের উপ- পরিদর্শক আব্দুর সবুরকে। অন্যদিকে পুলিশ হেফাজতে হিমাংশু রায়ের ‘আত্মহত্যা’র পেছনে পুলিশের দায়িত্ব পালনে কোনো অবহেলা আছে কি না তা খতিয়ে দেখতে ৩ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে পুলিশ।

এর আগে গত শুক্রবার ভোররাতে ওই উপজেলার ভেলাগুড়ি ইউনিয়নের পূর্ব কাদমা এলাকায় নিজ বাড়িতে কথিত ডাকাতির ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের শিকার হন হিমাংশু রায়ের স্ত্রী সাবিত্রী রানী। স্থানীয় লোকজন ও পুলিশের সন্দেহ, হত্যাকাণ্ডের সাথে হিমাংশু রায়সহ আরও কেউ জড়িত থাকতে পারে।

খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে এবং হিমাংশু রায়কে আটক করে থানায় নিয়ে এসে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। এ সময় নারী হেল্প ডেস্ক রুমে রাখা হলে ওই রুমে থাকা তার দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন হিমাংশু রায়। পরে তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়া হয়। কর্মরত চিকিৎসক তাকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।

পুলিশ হেফাজতে জিজ্ঞাসাবাদে হিমাংশু রায় পুলিশকে জানান, তিনি পাশে এক অনুষ্ঠান থেকে ভোর সাড়ে তিনটার দিকে বাড়ি ফিরে তার বড় মেয়ে প্রিয়াংকার কাছে জানতে পান তার স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পরে ঘরের পাশে তুলসী গাছের নিচে স্ত্রী সাবিত্রী রানীর লাশ দেখতে পান।

তবে হিমাংশু-সাবিত্রীর মেয়ে প্রিয়াংকা জানান ভিন্ন কথা। তিনি কখনো বলেন, বাবা রাত ১২টার দিকে বাড়িতে এসেছে, তখন মাসহ আমরা ঘুমে ছিলাম। কখনো বলেন, বাবা আসার আগে কালো কোর্ট পড়া একজন লোক এসে মাকে গলাটিপে হত্যা করেন। তাহলে সেই লাশ ঘরের বাহিরে কীভাবে গেলো- এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রিয়াংকা বলেন, তখন আমি ঘুমে ছিলাম।

একটি সূত্র বলছে, হিমাংশু রায় আত্মহত্যার আগে পুলিশের কাছে দাবি করেছেন, তার ঘরে ৭২ হাজার টাকা ছিলো। সেই টাকা নাকি ডাকাতরা তার স্ত্রীকে হত্যা করে নিয়ে গেছেন। যদি তাই হয়, হিমাংশু রায়ের স্ত্রী সাবিত্রী রানী প্রতিবেশী একজনের কাছ থেকে দুইটি ছাগল ক্রয় করলেও সেই টাকা দিতে পারেননি কী কারণে। এছাড়া সাবিত্রী রানী কয়েকদিন আগে একটি এনজিও থেকে ৫০ হাজার টাকা লোন তুলেছেন, সেই টাকা নিয়ে কী কারণে বৃহস্পতিবার হিমাংশু-সাবিত্রীর মাধ্যে ঝগড়া হয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, ওই এলাকায় নিয়মিত জুয়া খেলা আসর জমে। সেই জুয়ার আসরে নিয়মিত যেতেন হিমাংশু। মৃত্যুর দুইদিন আগে জুয়া খেলতে গিয়ে হিমাংশু রায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা বাজিতে হেরে আসেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তাহলে সেটা কোন টাকা? ওই জুয়ার আসরের সাথে কারা কারা জড়িত ও কারা কারা জুয়া খেলতে যায়, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও এ হত্যকাণ্ডের রহস্যে বেরিয়ে আসতে পারে।

এদিকে প্রতিবেশীরা জানান, হিমাংশুর বাড়িতে মধ্যরাতে ডাকাতি হয়েছে- এমন কোনো ডাক-চিৎকার তারা শুনতে পায়নি। সকালে হিমাংশুর মুখে তারা শোনেন রাতে ডাকাতরা তার স্ত্রীকে হত্যা করে টাকা নিয়ে গেছে। এ সময় হিমাংশু রায়ের আচরণ দেখে তার প্রতি সন্দেহ হয় স্থানীয়দের। স্থানীয়রা সেই বিষয়টি পুলিশকে জানায়।

সরেজমিনে ওই এলাকা গিয়ে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায় হিমাংশু রায় ছিলেন বেকার। তিনি নিয়মিত জুয়া খেলতেন। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় প্রায়ই সাবিত্রী রানীকে নির্যাতন করতেন হিমাংশু রায়। ঘটনার দিনও পাশে এক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অজুহাতে জুয়া খেলে ভোররাতে বাড়ি ফিরেছেন হিমাংশু।

এলাকাবাসী বলছেন, যদি হিমাংশুর বাড়িতে ডাকাতি হয়, তাহলে ঘটনার সময় বা তার পরে ডাক-চিৎকার করা হলো না কেনো? হিমাংশু-সবিত্রীর বড় মেয়ে প্রিয়াংকা বলছে একজন কালো কোর্ট পরা লোক এসে তার মাকে গলা চপে ঘরের ভেতরে হত্যা করেছে। প্রিয়াংকার কথা যদি সত্য হয় তাহলে সেই লাশ ঘর থেকে বাইরে বের করলো কে? অনেকেই সন্দেহ করেছেন, সাবিত্রী হত্যাকাণ্ডের সাথে তার স্বামী হিমাংশু রায় জড়িত থাকতে পারে এবং এ হত্যাকাণ্ডে কেউ না কেউ হিমাংশু রায়কে সহযোগিতাও করেছেন।

এ বিষয়ে হিমাংশু রায়ের বাবা বিশ্বেস্বর রায় বলেন, আমার ছেলের বউ হত্যাকাণ্ডের সাথে আমার ছেলে জড়িত থাকলেও থাকতে পারে। সেটা যেহেতু দেখি নাই, এ নিয়ে কী বলি? আমার ছেলে আত্মহত্যা করেছে, ছেলের মৃত্যু নিয়ে আমার কোনো অভিযোগ নেই। ছেলে আত্মহত্যা করেছে তা মেনে নিয়েই সৎকার করেছি।

হত্যাকাণ্ডের শিকার সাবিত্রী রানীর ভাই খগেন চন্দ্র বলেন, আমার বোনকে হত্যা করা হয়েছে। ভাগনি দুটির ভবিষ্যৎ চিন্তা করে এ নিয়ে আর বাড়াবাড়ি করতে চাই না। আমরা নিজেদের মধ্যে মীমাংসা করে নিয়েছি। তবে আমার বোনের হত্যাকাণ্ডের সাথে একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারে।

সাবিত্রী রানী হত্যাকাণ্ডের তদন্তকারী কর্মকর্তা ও ডিবি পুলিশের উপ-পরিদর্শক আব্দুর সবুর বলেন, এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পরিবারের লোকজন তেমন কথা বলতে চাচ্ছে না। প্রশ্নগুলোর উত্তর বের হলে এ হত্যাকাণ্ডের রহস্য বের হবে।

লালমনিরহাটের পুলিশ সুপার আবিদা সুলতানা বলেন, সাবিত্রী হত্যাকাণ্ড ও পুলিশ হেফাজতে হিমাংশু রায়ের আত্মহত্যার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পুলিশের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাবিত্রী হত্যাকাণ্ড নিয়ে ডিবি পুলিশ কাজ করছে। তদন্ত প্রতিবেদন পেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মন্তব্য করুন


Link copied