আর্কাইভ  মঙ্গলবার ● ১৮ জানুয়ারী ২০২২ ● ৫ মাঘ ১৪২৮
আর্কাইভ   মঙ্গলবার ● ১৮ জানুয়ারী ২০২২

সরকারি চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় ফি’র বোঝা কেন?

মঙ্গলবার, ১২ অক্টোবর ২০২১, সকাল ০৯:২০

পিয়াস সরকার

অনার্স-মাস্টার্স শেষ জিয়াউল হক সুমনের। এতিহ্যবাহী কারমাইকেল কলেজ, রংপুর থেকে উদ্ভিদবিদ্যায় লেখাপড়া শেষ করেছেন তিনি। বাবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক।

জিয়াউল বলেন, আগে টিউশনি করে চলতাম আমি। বাবার পেনশনের টাকায় বাবা-মায়ের চিকিৎসা ব্যয়ই মেটে না। ছোট বোন এবার এইচএসসি পরীক্ষা দেবে। খুবই অভাবে দিন চলছে। করোনার সময় টিউশনি হারালাম। না পারছি কোনো কাজে যোগ দিতে। না পারছি সরকারি চাকরির আশা ছাড়তে। ঢাকায় হয় অধিকাংশ পরীক্ষা। তাই দুই মাস যাবৎ ঢাকায়।

তিনি আরও বলেন, বেকার অবস্থায় এই থাকা খাওয়ার অর্থের পাশাপাশি বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে চাকরির পরীক্ষার আবেদন। একেকটি পরীক্ষায় আবেদন ফি দিতে হয় গড়ে ৫০০ টাকা। আমি বেকার। বেকারের জন্যই চাকরির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এত টাকা মিলবে কোথায়?

করোনার কারণে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল চাকরির পরীক্ষা। করোনার সংক্রমণ কমায় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সচল হওয়ায় ফের খুলেছে চাকরি পরীক্ষার দুয়ার। কিন্তু বেকার চাকরি প্রত্যাশীদের বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে আবেদন ফি। সুমনের মতো লাখো শিক্ষার্থী আছেন ভোগান্তিতে।

বেশ কয়েকটি চাকরি পরীক্ষার ফি ঘেঁটে দেখা যায় বেসরকারির তুলনায় সরকারি চাকরির পরীক্ষার ফিই বেশি। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্প করপোরেশনে পরীক্ষায় তিন পদে আবেদন ফি রাখা হয় ৭০০, ৫০০ ও ৩০০ টাকা। সিভিল এভিয়েশন অথরিটি অব বাংলাদেশের পরীক্ষার চাকরির ফি দুই পদের জন্য যথাক্রমে ২২৪ ও ৫৬০ টাকা করে। বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের লাইন ক্রু লেভেল-১ এর আবেদন ফি ১০০ টাকা। তাদেরই আরেক পরীক্ষায় রাখা হয় ৪০০ টাকা। মেট্রোরেলে আবেদন ফি ৫০০ টাকা। বঙ্গবন্ধু বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১২০০ টাকা। বাংলাদেশ গ্যাস ফিল্ডস কোম্পানি লিমিটেড ৩৩৬ টাকা। সাধারণ বিমা করপোরেশনে আবেদন ফি যথাক্রমে ৫০০ ও ৩০০ টাকা। নৌবাহিনীতে আবেদন ফি ৭০০ টাকা।

ডাক বিভাগ মাত্র ১১২ ও ৫৬ টাকা আবেদন ফি নেয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন ফি রাখা হয় ১০০ টাকা। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে যথাক্রমে ৩৩৬ ও ২২৪ টাকা। এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক বিনামূল্যে তাদের চাকরি পরীক্ষা নেয়। সমন্বিত সাত ব্যাংকের পরীক্ষায় আবেদন ফি ২০০ টাকা। আবার বিআর পাওয়ার জোন লিমিটেডে জনবল নিয়োগে ২০০০ টাকা আবেদন ফি ধরা হয়েছে। যদিও এই প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য থাকতে হবে ২০ বছর কাজের অভিজ্ঞতা। সরকারি চাকরি প্রত্যাশীদের প্রথম পছন্দ বিসিএস’এ আবেদন ফি ৭০০ টাকা।

আর এনটিআরসিএ’তো একধাপ এগিয়ে। তারা তৃতীয় গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৫৪ হাজার ৩০৪ জন শিক্ষক নিয়োগের আবেদন শেষ হয়েছে। এনটিআরসিএতে একজন চাকরি প্রত্যাশী শিক্ষককে আবেদন করতে হয় একাধিক প্রতিষ্ঠানে। যেখানে একটি পদের জন্য ১৬০ জন পর্যন্ত আবেদন করেছেন। ১০০ টাকা আবেদন ফি। পৃথকভাবে মোট আবেদন পড়েছে ৯০ লাখ। এনটিআরসিএ আবেদনকারীদের কাছ থেকে পেয়েছে ৯০ কোটি টাকা। প্রথম ধাপে চাকরি প্রত্যাশীরা সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার জন্য আবেদন করেন ৩৫০ টাকা করে।

চাকরির পরীক্ষায় আবেদন ফি কমানোর দাবিও করা হয়েছে একাধিকবার। হয়েছে আন্দোলন, মানববন্ধন। আবেদন ফি কমানোর দীর্ঘদিন আন্দোলন করেছেন রক্তিম হাসান। তিনি বলেন, দেশের লাখো বেকার চাকরি প্রত্যাশীদের কাছে এই অর্থ নেয়াটা অমানবিক। বেকার চাকরি প্রত্যাশীদের যেখানে বেকার ভাতা দেয়া উচিত সেখানে নেয়া হচ্ছে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত আবেদন ফি। পরীক্ষার জন্য একটা খরচ থাকে এটা সত্য। তবে সেটা হতে হবে যৌক্তিক। একটা পরীক্ষায় আবেদন লাখ ছাড়িয়ে যায়। ৫০০ টাকা করে আবেদন ফি হলে কতো টাকা তাদের আয় হিসাব করেছেন। তাই আমরা চাই আবেদন ফি উঠিয়ে দেয়া হোক। আর যদি নেয়া হয় তবে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা করা হোক। চাকরি প্রত্যাশী শারমিনা জুথি বলেন, আমরা বেকার এজন্যই এই আবেদন করছি। বেকারদের কাছে কেন টাকা নেয়া হবে? আমাদের উল্টা বেকার ভাতা দেয়ার কথা। শুধু কি তাই। পরীক্ষাগুলো অধিকাংশই হয় ঢাকায়। আমরা যারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকি পরীক্ষা দেয়ার জন্য যেতে হয় ঢাকায়। এতেও তো চলে যায় কয়েক হাজার টাকা।

কিন্তু কেন নেয়া হয় এই অর্থ? জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুাতায়ন বোর্ডের একজন পরিচালক নাম প্রকাশ করার না শর্তে বলেন, আমাদের নিয়োগ পরীক্ষার জন্য নানা ধাপ পার হয়ে যেতে হয়। প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ব্যবস্থা গ্রহণ, মূল্যায়ন করা ইত্যাদি। এসবে তো একটা খরচ রয়েছেই। কিন্তু এত অধিক অর্থ নেয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, পরীক্ষাটা নেয়াটা যেহেতু আমাদের মূল কাজের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাই বাড়তি অর্থ দিয়ে কর্মচারী কর্মকর্তাদের খুশি করার বিষয়ও থাকে।

দেশে বেকারের সংখ্যা বাড়ছে। পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষিত বেকার সংখ্যা। সর্বশেষ ২০১৬ তথ্যানুযায়ী শ্রমশক্তি জরিপ বলছে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। এই বছরে ও করোনাকালে যে তা বেড়েছে তা অনুমেয়। লন্ডনের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট বলছে, বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রতি ১০০ জনে ৪৭ জন।

আর বিষয়টি নিয়ে শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন এটাকে অমানবিক বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বেকার শিক্ষার্থীদের জন্য এই পরীক্ষাগুলো আবেদন ফি ছাড়া করা উচিত। প্রয়োজনে তারা কিছুটা শর্ত বাড়িয়ে কম আবেদনকারী নিতে পারে কিন্তু তাদের কাছে এত অধিক নেয়াটা অমানবিক।

মন্তব্য করুন


Link copied